Uncategorized

মানিকগঞ্জে কিংবদন্তি সিপিবির দুই নেতাকে স্মরণ করে প্রয়াত কমরেড আজহার ইসলাম আরজুর পুত্রের আবেগময়ী স্ট্যাটাস

  Admin1234@ ১৮ নভেম্বর ২০২৫ , ৫:৪৩:৩৫ 206

লেখক: মেহেদী হাসান সজীব
রিজার্ভ ট্যাংক, মানিকগঞ্জ।

মানিকগঞ্জে বাম রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য বলিষ্ঠ ভুমিকা ছিলেন প্রয়াত কমরেড বীরমুক্তিযোদ্ধা আজহারুল ইসলাম আরজু ও বীরমুক্তিযোদ্ধা এড মিজানুর রহমান হযরত।দুজনেরই ষাটের দশকে রাজনীতির হাতে খড়ি।ছাত্র রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, বুলগেরিয়া উচ্চ শিক্ষার জন্য গমন, এরশাদবিরোদী আন্দোলন সহ মানিকগঞ্জের স্থানীয় আন্দোলন, হাট বাজারের খাজনা বাতিলকরণ, নয়াকান্দী বাঁধ, ধলেশ্বরী নদী বাঁচাও আন্দোলনসহ বাম রাজনীতিতে এরা দুই মানিকজোড়। ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি কমরেড আজহারুল ইসলাম পরলোকগমন করেন।সম্প্রতি বীরমুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট মিজানুর রহমান হযরতও দীর্ঘদিন রোগ ব্যাধির সাথে লড়াই করে না ফেরার দেশে চলে যান।

তাঁদের বন্ধুত্বের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন কমরেড আজহারুল ইসলাম আরজুর একমাত্র পুত্র, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান সজীব। তিনি তার লেখায় তুলে ধরেন,

“বেঁচে থাকতে সমান তালে চললেও… মৃত্যুর পথটা এত ভিন্ন হলো”। কেন?

জীবনে অনেক গল্প শুনেছি তোমাদের বন্ধুত্ব নিয়ে—
কিন্তু তোমার শেষ দিনে যেদিন তোমার লাশের পাশে বসে হযরত কাকা শিশুর মতো চিৎকার করে কেঁদে বলছিলেন—‘তুই এত বড় বেইমানি করলি কেন?সারাজীবন একসাথে চললাম, আর যাওয়ার সময় আমাকে কিছু না বলে একা চলে গেলি!যামুতো আগে আমি তুই গেলি কেন?

সেদিন বুঝেছি—এই দুই মানুষ শুধু সংগঠনের নেতা ছিলেন না,
এরা ছিল পরস্পরের জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ।

আব্বু ,
সারা জীবন তুমি আর কাকা একইসাথে পথ চলেছ।
একই রাজনীতি, একই সংগ্রাম, একই মানুষের ভরসা।
মানিকগঞ্জে অনেকেই তোমাদের মানিকজোড় বলত।আগে বিষয়টা তেমন বুঝতাম না,আজকে বুঝি এটা শুধু ডাকনাম ছিল না,
এটা ছিল বাস্তবতা।

তুমি সব সময়ই বলতা—
“আমি অসুস্থ হয়ে তুমগো কারো বোঝা হব না। আমি যখন মারা যাব হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগও পাইবা না।”আর ঠিক তাই হলো।
সারাদিন মানুষের সাথে বিভিন্ন ভাবে সময় কাটিয়ে রাতে ঘুমানোর আগে তুমি চুপচাপ চলে গেলে।
কেউ কল্পনাই করতে পারেনি এত দ্রুত হবে।

আর কাকাও এই তো সেদিন আমাকে বললো “এই রাস্তাঘাটের অবস্থা এমন, দুনিয়া ভরে এতো কিছু করছ এটা নিয়া কিছুই করসনা, আমার কিছু হলে লাশও বের করতে পারবি না।”
দুঃখের বিষয়, সেটাই সত্যি হলো তার ক্ষেত্রে, স্ট্রোকের পর ৫–৬ বছর নিজের জীবনটা নিয়ে যোদ্ধার মতো লড়েছে।যতবার হাসপাতালে নিতে হয়েছে, তুমি থাকতে ও তো তুমি সহ সবাই ভেবেছি এবারই হয়তো শেষ কিন্তু সে বারবার ফিরে এসেছে যুদ্ধ জয় করে।

কিন্তু এবার আর তার ফেরা হলো না , কে জানে হয়তো পাশে তুমি নেই বলে এবারের যুদ্ধ টা একা আর জিততে পারলো না ।

তুমি যেদিন চলে গেল সেদিনই অনেক মানুষ বলছিল তোমাদের হাতে গড়া সিপিবি সহ আর অনেক সংগঠন আজকে এতিম হয়ে গেল। সত্যি বলতে এখন আসলেই পরিপূর্ণ ভাবে এতিম হয়েই গেল ।
কিন্তু আমার কষ্টটা অন্য জায়গায়—

তোমাকে যেভাবে সবাই তোমার বাড়িতে এসে নিয়ে গেছে, স্নেহ–ভালোবাসায়, মর্যাদায় দাফন করতে—মানুষ ছিল, ভিড় ছিল, হাত রেখে বিদায় জানাতে পেরেছে।

তোমার বন্ধুর ক্ষেত্রে তো আমরা তা করতে পারলাম না।
কাকার ক্ষেত্রে সবটাই উল্টো হলো।
রাস্তা পানিতে ডোবা,
সেদিন রাতে যখন কাকা অসুস্থ হলো—কয়েকজন মিলে তাকে কোলে করে অন্য বাড়ির গেট দিয়ে নিয়ে হসপিটালে পাঠাতে হলো ।
এমনকি লাশবাহী গাড়িটাও বাসার সামনে আসতে পারেনি।
দূর থেকে নামিয়ে
আবারও সেই বাসার ভেতর দিয়েই লাশ আনতে হয়েছে।
দাফনের আগ পর্যন্ত তাকে নিজের বাড়িতেও রাখা গেল না— গোসলের সময়ই লাশ অনেকটাই নরম হয়ে গিয়েছিল বলে গোসল শেষে তড়িঘড়ি করে আবার ফ্রিজিং গাড়িতে নিয়ে রাখতে হয়েছে ।
দাফনের আগে পর্যন্ত রাস্তার উপর সেই গাড়িতেই পড়ে থাকতে হয়েছে।

আব্বু …
তোমরা দু’জন যেভাবে জীবন কাটালে, যেভাবে মানুষের জন্য কাজ করলে—
তোমাদের শেষ সময় যে এতটা ভিন্ন হবে কেউ কোন দিন ভাবতেও পারিনি—

তাই আজও মনে একটা প্রশ্ন ঘুরে—

বেঁচে থাকতে তোমরা যেভাবে পাশাপাশি চললে,
মৃত্যুর পথটা এত আলাদা হলো কেন আব্বু ?

তুমি আর হযরত কাকা শুধু বন্ধু ছিলে না—
তোমরা ছিলে একে অপরের জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানুষ।
তোমরা ছিলে মানিকগঞ্জের ইতিহাসের অংশ।
আর এই শেষ অধ্যায়।

আরও খবর:

Sponsered content